হারুত ও মারুত দুই ফেরেশতা, যাদের কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা একটি বিশেষ দায়িত্ব নিয়ে মানুষের পরীক্ষার জন্য পৃথিবীতে প্রেরিত হয়েছিলেন। তাদের বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য কুরআন ও তাফসিরের আলোকে বিশ্লেষণ করা দরকার।
কুরআনে হারুত ও মারুতের উল্লেখ
আয়াত:
“তারা সেই বিষয়ের অনুসরণ করল যা শয়তানরা সুলায়মানের রাজত্বকালে পাঠ করেছিল। আর সুলায়মান (আঃ) কুফরি করেননি, বরং শয়তানরাই কুফরি করেছিল। তারা মানুষকে জাদু এবং বাবেল (বাবিল)-এ হারুত ও মারুত নামক দুই ফেরেশতার ওপর নাযিলকৃত জাদু শিক্ষা দিত। অথচ তারা (ফেরেশতারা) কাউকে কিছুই শেখাত না, যতক্ষণ না বলত, ‘আমরা তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য পাঠানো হয়েছি, কাজেই তোমরা কুফরি করো না।’ মানুষ তাদের থেকে এমন কিছু শিখে নিত যা দ্বারা তারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাত। কিন্তু আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তারা এর মাধ্যমে কারো কোনো ক্ষতি করতে পারত না। তারা এমন কিছু শিখত যা তাদের ক্ষতি করত এবং কোনো উপকার করত না।”
(সূরা আল-বাকারা: ১০২)
হারুত ও মারুতের বিষয়ে ব্যাখ্যা
১. আল্লাহ তাদের কখন এবং কেন পাঠিয়েছিলেন?
• কখন:
হারুত ও মারুতকে পৃথিবীতে পাঠানো হয় সুলায়মান (আঃ)-এর সময়কালে, যখন মানুষের মধ্যে জাদু ও অন্ধবিশ্বাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।
• কেন:
তাদের পাঠানোর মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের জন্য একটি পরীক্ষা তৈরি করা। আল্লাহ তাআলা চেয়েছিলেন মানুষকে দেখানো যে, জাদু কেবল একটি পরীক্ষা এবং এটি ব্যবহার করা কুফরির শামিল।
২. তাদের দায়িত্ব:
• তারা মানুষের কাছে জাদুর প্রকৃতি এবং এর ক্ষতিকর দিকগুলো শিক্ষা দিত।
• তবে শর্ত ছিল, তারা কাউকে কিছু শেখানোর আগে সতর্ক করে বলত যে, এটি কেবল পরীক্ষা এবং এটি ব্যবহার করা কুফরির অন্তর্ভুক্ত।
• তাদের মূল কাজ ছিল, মানুষের ঈমান পরীক্ষা করা এবং তাদেরকে জাদুর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করা।

তারা কি ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করেছিলেন?
• হ্যাঁ, তারা দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করেছিলেন।
আয়াতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, তারা কাউকে জাদু শেখানোর আগে সতর্ক করতেন এবং বলতেন, “আমরা তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য প্রেরিত হয়েছি, সুতরাং কুফরি করো না।”
• তবে কিছু মানুষ তাদের সতর্কতা উপেক্ষা করে জাদু শিখে নেয় এবং তা অপব্যবহার করে। ফলে তাদের ঈমান নষ্ট হয়ে যায়।
মানুষের দোষ:
মানুষের মধ্যে এমন একটি প্রবণতা ছিল, যারা জাদুর মন্দ দিকগুলো জানার পরও এটি শিখে ক্ষতি করার কাজে ব্যবহার করত। এর ফলে তারা নিজেদের জন্য কুফরির পথে চলে যেত।
তারা এখন কোথায় আছেন?
• তাফসিরে উল্লেখ করা হয়েছে, হারুত ও মারুত ফেরেশতা হওয়ায় তাদের পৃথিবীর দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর আল্লাহ তাদের শাস্তি দিয়েছেন এবং তাদেরকে একটি বিশেষ জায়গায় বন্দি করে রেখেছেন।
• ইবনে কাসিরের তাফসির অনুযায়ী:
তাদেরকে বাবিল (বর্তমান ইরাক)-এর কোনো জায়গায় শাস্তিস্বরূপ বন্দি করা হয়েছে।
• তবে এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য কুরআন ও সহিহ হাদিসে পাওয়া যায় না।
জাদুর বিষয়ে ইসলামিক শিক্ষা
১. জাদু শিখা ও ব্যবহার করা হারাম:
• জাদু কুফরি এবং শিরকের অন্তর্ভুক্ত। এটি মানুষের ঈমান ধ্বংস করে।
• রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“সাতটি ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে বাঁচো।” এর মধ্যে তিনি জাদুকে উল্লেখ করেছেন।
(সহিহ বুখারি: ৫৭৬৪, সহিহ মুসলিম: ৮৯)
২. জাদুর প্রকৃতি:
• জাদু ক্ষতিকর এবং এটি শয়তানের সহযোগিতায় কার্যকর হয়।
• এটি আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কার্যকর হতে পারে না।
হারুত ও মারুত থেকে শিক্ষাগুলো
• জাদু একটি পরীক্ষা:
আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য জাদুকে উপলক্ষ হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
• অবাধ্যতার পরিণাম:
যারা জাদু শিখে কুফরি করে, তারা পরকালে কঠিন শাস্তি পাবে।
• আল্লাহর ওপর নির্ভরশীলতা:
জাদুর ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া উচিত।
উপসংহার
হারুত ও মারুতের ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, জাদু শেখা ও ব্যবহার করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং এটি মানুষের ঈমানের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। তারা তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছিলেন, তবে কিছু মানুষ তাদের সতর্কতা উপেক্ষা করে জাদুর অপব্যবহার করেছিল। আমাদের উচিত আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা এবং এই ধরনের পরীক্ষার ফাঁদে না পড়া।
আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক পথে থাকার তাওফিক দিন এবং সকল প্রকার জাদু ও শয়তানি ফাঁদ থেকে রক্ষা করুন। আমিন।